বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে মোস্তাফা জব্বারের অসাধারণ লেখা

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে মোস্তাফা জব্বারের অসাধারণ লেখা

গত ১২ মে ২০১৯ মহাকাশে জয় বাংলা খচিত উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ উৎক্ষেপণের এক বছর অতিক্রান্ত হলো। বিশ্বে বাঙালির স্বাধীন স্বত্বার বিকাশের একটি বড় প্রতীক হিসেবে এ উপগ্রহ বিশ্ববাসীকে জানাচ্ছে যে, তলাহীন ঝুড়ির একটি দেশ নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হয়েছে। সেই স্যাটেলাইট সারা বিশ্বের কাছে তার সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে প্রকাশ করছে। আমি যখন এ প্রতিবেদনটি লিখছি তখন দেশের ১০টি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এ স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সম্প্রচার করছে। বাকি চ্যানেলগুলো আগামী ১৯ মের মাঝে সম্প্রচার করবে। আশা করছি সেদিন আমরা সব চ্যানেলের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষর করব। দেশের সব চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট যাতে ব্যবহার করতে পারে তার জন্য সব কারিগরি কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৯ তারিখে আমরা একটি নতুন যুগের সূচনা করতে সক্ষম হব।

বাংলাদেশের একটি নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকতে পারে এই ভাবনার সূচনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়কালে। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু বিশ্ব টেলিকম সংস্থা আইটিইউ’র সদস্যপদ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৫ সালের জুন মাসের ১৪ তারিখে বেতবুনিয়ায় উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র উদ্বোধনের সময় মহাকাশে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারই সুযোগ্যা কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের লক্ষ্যস্থির করেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের মে মাসে বিটিআরসি’র কমিশনারকে (এসএম) আহ্বায়ক করে গঠিত ‘স্যাটেলাইট কমিটি’ কর্তৃক ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ নামকরণের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় ২০০৯ অনুযায়ী ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি মহাকাশে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল।

২০১৮ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ এবং সেটির সফল পরিচালনা ছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্রের নামকরণ তারই দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে করতে পেরেছি।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণের সর্বশেষ উদ্যোগের বাইরেও কিছু অতীত কথা আছে। আমার মনে আছে শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন ৯৭ সালে ‘কেমন করে বাংলাদেশ থেকে সফটওয়্যার রফতানি করা যায়” তার উপায় উদ্ভাবন করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করেন। সেই টাস্কফোর্সের প্রধান ছিলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। বিসিএসের সভাপতি হিসেবে আমিও সেই টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলাম। টাস্কফোর্স মোট ৪৫টি সুপারিশ প্রদান করেছিল। কমিটির কাছে আমি বাংলাদেশের একটি নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকার সুপারিশ করতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু টাস্কফোর্স ‘এখনও সময় হয়নি’ এই বিবেচনায় প্রস্তাবটি সুপারিশ আকারে পেশ করেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বসে থাকেননি। তার সরকার বাংলাদেশের একটি স্যাটেলাইট পাবার প্রকল্প গ্রহণ করে। জাপান সরকার সে প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে সম্মতিও প্রদান করে। তৎকালীন মন্ত্রী নুরুদ্দীন খান ১৮ সালে আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় বিষয়টি সম্পর্কে জানান। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ার প্রাথমিক কারণ ছিল যে, স্যাটেলাইটটির সঙ্গে স্পার্শোর যুক্ত হওয়ায় জাপানি অর্থায়ন নিশ্চিত করা সময়সাপেক্ষ হয়ে যায়। অন্যদিকে ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকার সে প্রকল্পটি বাতিল করে। তারই ফলে স্যাটেলাইট নিয়ে আমাদের ভাবতে হয় ২০০৯ সালে। এরপর ১২ সালে ৮৬.৮১ কোটি টাকার একটি প্রস্তুতি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পটির ব্যয় ১৪৬.৪১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।

এ প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্দেশ্যে ‘স্যাটেলাইট কমিটি’ বিস্তারিত বিবরণসহ টেন্ডার দলিল প্রস্তুত করে। এ প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে ৩২টি পরামর্শক সংস্থা প্রস্তাব দাখিল করে। মূল্যায়নের পর বাছাইকৃত ৭টি সংস্থার কাছে দরপ্রস্তাব চাওয়া হয় এবং প্রাপ্ত দরপ্রস্তাব মূল্যায়ন করে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক অনুমোদনের পর ‘এসপিআই’ নামক মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত ২৯ মার্চ ২০১২ তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

অরবিটাল স্লট : স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য অরবিটাল স্লট একটি প্রধান ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে বাংলাদেশের ফাইলিংকৃত ৭৪ ডিগ্রি, ১৩৩ ডিগ্রি, ৬৯ ডিগ্রি এবং ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল সøটসহ অন্যান্য অরবিটাল সøট নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব ফাইলিংকৃত উপরোক্ত অরবিটাল সøট গুলির কো-অর্ডিনেশন জটিলতা এবং তরঙ্গ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে বিকল্প অরবিটাল সøট অনুসন্ধান করা হয়। এ অনুসন্ধান কালে ৪৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা হতে ১৩৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত আর্কের মধ্যে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রঘিমা অরবিটাল সøট লিজ/ক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায় এবং সার্বিক দিক বিবেচনায়, প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসপিআই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের জন্য ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল সøটটি উপযোগী হিসেবে সুপারিশ করে। অতঃপর ইন্টার স্পুটনিকের সঙ্গে প্রথমে একটি এমওইউ স্বাক্ষর হয় এবং পরে মোট ২৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে একটি ব্যবসা পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্প অনুমোদন: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ সংক্রান্ত কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য পরামর্শকের সহায়তায় প্রস্তুতকৃত ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ শীর্ষক প্রকল্পের ‘ডিপিপি’ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনে দীর্ঘ পর্যালোচনার পর গত ১৬-০৯-২০১৪ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘একনেক’ সভায় মোট ২৯৬৭.৯৫৭৭ কোটি টাকায় (জিওবি ১৩১৫.৫১৩৫ কোটি টাকা ও প্রকল্প সাহায্য ১৬৫২.৪৪৪২ কোটি টাকা) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের সংশোধিত মূল্য মোট ২৭৬৫.৬৬২৫ কোটি টাকা (জিওবি ১৪০৬.৯০৫৩ কোটি টাকা ও প্র:সা: ১৩৫৮.৭৫৭২ কোটি টাকা)। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ প্রকল্পের প্রধান অঙ্গসমূহ হলো : স্যাটেলাইট নির্মাণ, কক্ষ পথে উৎক্ষেপণ, দুটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন ও ফ্যাসিলিটি নির্মাণ, স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি গঠন, প্রয়োজনীয় বীমা সংগ্রহ, অরবিটাল সøট লিজ/ক্রয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা।

স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয় : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বৈদেশিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কারিগরি বিনির্দেশ ও দরপত্র প্রণয়ন করা হয়। প্রণীত টেন্ডার দলিলের ভিত্তিতে মার্চ ২০১৫ তে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হলে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা ও চীনের মোট ৪টি স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। মূল্যায়ন কমিটির বিচার বিশ্লেষণের পর ফ্রান্সের থ্যালাস এলেনিয়া কোম্পানি একমাত্র সফল দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয় প্রস্তাবটির অনুমোদন দেয়ার পর ১১ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীসহ সংসদীয় কমিটির সদস্যবৃন্দ, কূটনীতিক ও দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিতিতে থ্যালাসের সঙ্গে মোট ১৯৫১, ৭৫, ৩৪, ৪৮২/- টাকা মূল্যে স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (সংশোধিত চুক্তি মূল্য কমে গিয়ে মোট ১৯০৮.৭৫ কোটি টাকা)।

কাভারেজের আওতা : কারিগরি বিনির্দেশ ও চূড়ান্ত ডিজাইন অনুযায়ী ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ ১১৯.১ ডিগ্রি পুঃদ্রাঃ অরবিটাল লোকেশনে সফল তরঙ্গ সমন্বয় সাপেক্ষে সমগ্র বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং ‘স্তান’ ভুক্ত দেশসমূহের অংশ বিশেষ কাভারেজের আওতায় আসবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর কমিউনিকেশন মডিউল ও সার্ভিস মডিউল : ২০১৭ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর প্রধান দুটি মডিউল (কমিউনিকেশন মডিউল ও সার্ভিস মডিউল) তৈরি ও একীভূতকরণের কাজ এবং সোলার প্যানেল, এন্টেনা তৈরির কাজ শেষ হয়। প্রকল্পের বৈদেশিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এর দুজন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে থ্যালাসের উক্ত ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটিতে বর্ণিত কার্যাদি সম্পন্ন হয়।

বস্তুত ২০১৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর নির্মাণকাজ চলতে থাকে। নির্মাণকাজ শেষে গত ১৭-২১ নভেম্বর ২০১৭ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর প্রি শিপমেন্ট সম্পন্ন করার আগে প্রায় ৬ মাস ধরে মোট ৪টি ধাপে থ্যালাস কর্তৃক সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।

মহাকাশে উৎক্ষেপণ : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস এক্সকে দায়িত্ব দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবার নিরলস পরিশ্রম শেষে বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’, উৎক্ষেপণের জন্য চূড়ান্তকৃত দিনক্ষণ অনুযায়ী প্রথমে ৭ মে, পরে ১০ মে ও সর্বশেষে গত ১১ মে ২০১৮ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ১৪ মিনিট অর্থাৎ ১২ মে ২০১৮ বাংলাদেশ সময় ভোর রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেইপ ক্যানাভেরালে অবস্থিত লঞ্চপ্যাড- থেকে লঞ্চ ভেহিকেল ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে¡ একটি প্রতিনিধিদল উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন। যথাসময়ে উৎক্ষেপণের কাজটি না হবার ফলে আমরা সেই অনুষ্ঠানটি দেরিতে করি। গত ৩১ জুলাই ১৮ বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে আমরা বাংলাদেশেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ জাতীয়ভাবে উদ্যাপন করি।

বর্ষপূর্তি : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ হয় ১২ মে ২০১৮। এবার আমরা তার প্রথম বর্ষপূর্তি উদ্্যাপন করছি। সবকিছু সঠিকভাবে চললে ১৯ মে ১৯ আমরা এ বর্ষপূর্তির আনুষ্ঠানিক উৎসব পালন করব। যদিও ১২ মে আমরা অনুষ্ঠানটি করতে চেয়েছিলাম এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে সেই অনুষ্ঠানে থাকবেন বলে সম্মত হয়েছিলেন তবুও তার ব্যস্ততার জন্য আমরা তার অনুপস্থিতিতেই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করছি।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোন কাজে লাগবে : সংক্ষেপে জানা যেতে পারে যে, এই স্যাটেলাইট আমাদের কোন কোন কাজে লাগছে।

১। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উন্নত টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক ডিজিটাল সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের সরাসরি শহরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে না গিয়েও রোগীর টেস্ট রিপোর্ট এক্সরে-ইমেজ ইত্যাদি তথ্য ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শেয়ার করে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য যে টেলি-মেডিসিন প্রযুক্তি আছে তাও সম্ভব হবে এ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কভারেজ দেশের সর্বত্র বিদ্যমান তাই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল ও দ্বীপেও এ সব সেবা প্রদান করা যাবে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দূরের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত প্রফেসরের ক্লাস ই-লার্নিং বা ই-এডুকেশন পদ্ধতিতে ঘরে বসে সম্পন্ন করা যাবে। হাতিয়া দ্বীপে প্রথম টেলি মেডিসিন কেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের টেলি মেডিসিনে ব্যবহার শুরু করেছি।

২। কোনরূপ ক্যাবল সংযোগ ছাড়াই ঘরে রিসিভার যন্ত্র স্থাপন করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডিটিএইচ (ডাইরেক্ট টু হোম) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট টিভির বিভিন্ন চ্যানেল দেখা যাবে। ডিজিটাল এ পদ্ধতিতে টিভি চ্যানেলের গুণগতমান ক্যাবল টিভির চেয়ে অনেক উন্নত। ডিটিএইচসহ স্যাটেলাইট ভিত্তিক নতুন সেবার মাধ্যমে নতুন আয়ের সুযোগ হবে এবং এসব বিভিন্ন সেবায় লাইসেন্স ফি ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।

৩। যে সব স্থানে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন করা সম্ভব নয় অথবা রেডিও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক নেই সে সব জল ও স্থল সীমায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা প্রদান করা যাবে। দুর্গম দ্বীপাঞ্চলে এ সেবা প্রদানের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থাৎ ঝড়, বন্যা বা ভূমিকম্পে টেলিযোগাযোগের জন্য ব্যবহƒত অপিটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক বা ট্রান্সমিশন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে। এবার ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলার সময় এটি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে।

৪। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং ২০টি দেশের বাইরের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এ ২০টি ট্রান্সপন্ডার লিজ বা ভাড়া প্রদান করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। অর্থাৎ বর্তমানে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তার পরিবর্তে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবো। বাংলাদেশের সব টিভি এ স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। বিদেশের অনেক টিভি এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

৫। বিটিভি ওয়ার্ল্ডসহ দেশের সব কয়টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠানসূচি সম্প্রচারের জন্য বিদেশি স্যাটেলাইটের উপর নির্ভরশীল ছিল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীলতা আর নেই এবং বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রদেয় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হচ্ছে।

৬। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এটিএম বা অন্যান্য আর্থিক সেবা প্রদানের কর্মসূচিও হাতে নেয়া হয়েছে।

স্যাটেলাইট টেকনোলজি ও সেবার প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে যা দেশের বেকারত্ব কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। সর্বোপরি স্পেস টেকনোলজির জ্ঞান সমৃদ্ধ একটি মর্যাদাশীল জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট অনবদ্য ভূমিকা রাখবে।

‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে স্যাটেলাইট ক্ষমতাধর ৫৭তম দেশ হিসাবে গৌরব অর্জন করায় বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে মহাকাশ প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ উম্মুক্ত হয়েছে। এর ফলে সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ভূমিকা হবে সুদূর প্রসারী।

হেনরী কিসিঞ্জারের তলাহীন দেশটি আজ তার স্যাটেলাইটটির গায়ে জয় বাংলা লিখে মহকাশে উড্ডীন করতে পেরেছে; সেটি পুরো জাতির জন্য এক মহা গৌরবের। আমার নিজের কাছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে তিনটি বিশেষ অহঙ্কারের বিষয় আছে। প্রথমত এ প্রকল্পটি আমরা নির্ধারিত বাজেটের কমে সম্পন্ন করতে পেরেছি। দ্বিতীয়ত এটি সর্বোচ্চ ১৫ বছর চলমান থাকার কথা থাকলেও এখনকার মূল্যায়ন অনুসারে এর আয়ু ১৮ বছর হবে। তৃতীয়ত এ স্যাটেলাইটটি পরিচালনা করছে আমাদের সন্তানেরা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ : সবাই জানেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ২ আকাশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মাঝে সরকার নীতিগতভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত এমন যে সামনের তিন মাসের মাঝে একটি খসড়া প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পেশ করতে হবে। এখন সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে যে এর খুঁটিনাটি দিকগুলো স্থির করা। আশা করি সহসাই আমরা এটিও নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো।

বাঙালির মহাকাশ বিজয় এক সময়ে হয়তো স্বপ্নই ছিল। শিশুদের আমরা ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে স্বপ্ন দেখার জগতে নিয়ে যেতাম। কিন্তু এখন আর সেই দিন নাই-আমরা স্বপ্নে না বাস্তবে মহাকাশে বিচরণ করি।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সম্পাদক, বিজয় কিবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক]

COMMENTS